বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পর্যবেক্ষক চায় ইউজিসি

10
শিক্ষা সংবাদ,

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্থিক কেলেঙ্কারি ঠেকাতে সরকারি পর্যবেক্ষক বসাতে চায় বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি)। প্রেসিডেন্ট মো. আবদুল হামিদের কাছে এ সুপারিশ করেছে সংস্থাটি। এতে বলা হয়, বোর্ড অব ট্রাস্টিজের ক্ষমতার ভারসাম্য আনতে কমিশনের একজন সদস্য বা বিশ্ববিদ্যালয়

পর্যায়ের ২০ বছর শিক্ষকতায় অভিজ্ঞতা আছে এ রকম একজন সদস্যকে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পর্যবেক্ষক মনোনয়ন দেয়া যেতে পারে। এতে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা যাবে। এছাড়াও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নিয়োগ দেয়া নিরপেক্ষ সিএ ফার্ম দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে আয়-ব্যয় অডিট করার সুপারিশ করেছে ইউজিসি।

ইউজিসি’র সর্বশেষ ৪৩তম বার্ষিক প্রতিবেদনে এসব সুপারিশ করা হয়। ২০১৬ সালে সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে সার্বিক পরিস্থিতি তুলে ধরে প্রতিবেদনে বলা হয়, এসব সুপারিশ আগেও করা হয়েছে কিন্তু বাস্তবায়ন হয়নি।

সেটিকে আবারও সুপারিশ আকারে পেশ করছে কমিশন। সুপারিশে বলা হয়, কিছু বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় নিয়মিত সিন্ডিকেট ও একাডেমিক কাউন্সিলের সভা করে না। প্রতি বছর আর্থিক নিরীক্ষা জমা দেয় না। এটা বেসরকারি আইন ২০১০-এ সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অডিটের ক্ষেত্রে সিএ ফার্মের ক্ষেত্রে কিছু পরিবর্তন আনা প্রয়োজন মনে করে কমিশন। কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, বর্তমান যে পদ্ধতি অনুসরণ করে অডিট করা হয়, তাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের সঠিক আর্থিক চিত্র পাওয়া যায় না। কারণ তারা পছন্দের সিএ ফার্ম দিয়ে অডিট করান। এজন্য শিক্ষা মন্ত্রণালয় কর্তৃক নিরপেক্ষ কোনো ফার্ম নিয়োগ করে অডিট করানো যেতে পারে। ২০১৬ সালে শিক্ষা কার্যক্রম চালানো ৮৬টি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে মাত্র ৫টিতে প্রেসিডেন্ট কর্তৃক নিয়োগ পাওয়া ভিসি, প্রো-ভিসি, কোষাধ্যক্ষ এই তিনটি পদ পূরণ করতে পেরেছে। বাকিদের নানা ধরনের আল্টিমেটাম দেয়ার পরও এই তিনটি পদ পূরণ করতে পারেনি।

সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সমন্বিত ভর্তি পদ্ধতি চালু করার সময়ের দাবি মন্তব্য করে কমিশন বলেছে, প্রাথমিকভাবে মেডিকেল ভর্তির অনুরূপ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গুচ্ছভিত্তিক ভর্তি পদ্ধতি গ্রহণ করা যেতে পারে। এতে শিক্ষার্থী হয়রানি এবং ব্যয় সংকোচিত হবে। প্রশ্নপত্র ফাঁসে বিশেষ বিশেষ নজরদারি পদ্ধতি প্রবর্তন করতে হবে। প্রয়োজনে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার যেসব দেশে উন্নত প্রযুক্তি ও কঠিন নিরাপত্তা এবং গোপনীয়তা রক্ষা করে ভর্তি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয় তা অনুসরণ করা যেতে পারে। কওমি ও আরবি মাদ্‌রাসার জন্য তথ্য-প্রযুক্তি নির্ভর যুযোপযোগী কারিকুলাম প্রণয়ন করতে হবে। দেশের কওমি মাদ্‌রাসার বিশাল সংখ্যাক উচ্চশিক্ষা গ্রহণকারী শিক্ষার্থীদের কর্মসংস্থানের জন্য সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে মধ্যপ্রাচ্যে কাজের সুযোগ-সুবিধা করা যেতে পারে।

জাতীয় ও উন্মুক্ত এবং বিজ্ঞান প্রযুক্তি বিষয়ক সরকারি এবং অধিকাংশ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চতর ডিগ্রিধারী শিক্ষক সংকট রয়েছে। দেশে দক্ষ ফ্যাকাল্টি তৈরির জন্য বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের আদলে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ক বিশ্বমানের একটি গবেষণা কেন্দ্র স্থাপন করা উচিত। এই বিশ্ববিদ্যালয় শুধু স্নাতকোত্তর ডিগ্রি দিবে তারা দেশের আর্থ সামাজিক জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে গবেষণা করবে।

গবেষণা খাতের বরাদ্দ বাড়ানো হয়েছে, তবে তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। সরকার ঘোষিত ২০২১, ২০৩০ এবং ২০৪১ সালে উচ্চশিক্ষার জন্য কমিশন কর্তৃক স্ট্র্যাটেজিক প্ল্যান প্রণয়ন করা হয়েছে। এ লক্ষ্যমাত্র অর্জন করতে হলে শিক্ষাখাতের গবেষণার বরাদ্দ বাড়ানোর বিকল্প নেই। কেন্দ্রীয়ভাবে গবেষণা করার প্রস্তাব করেছে ইউজিসি। এতে বলা হয়, বিভিন্ন বিভাগীয় শহরে সেন্ট্রাল ল্যাবরেটরি তৈরি না করা পর্যন্ত বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদ (বিসিএসআইআর) ঢাকা ও আঞ্চলিক গবেষণাগার এবং আনবিক শক্তি কমিশনের গবেষণার সুযোগ দেয়া যেতে পারে। এছাড়াও শিক্ষকরা তাদের গবেষণাগুলো বিসিএসআইআর সংরক্ষণ করতে পারেন।

সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষার্থী সংখ্যা বহুগুণ বৃদ্ধি পেলেও ইউজিসি’র জনবল বাড়েনি। এজন্য শিক্ষার মান ও নিয়ন্ত্রণের জন্য ইউজিসিকে আরও শক্তিশালী ও জনবল বাড়ানোর প্রয়োজন। শুধু মন্ত্রণালয়কে সুপারিশ করার বাইরে কমিশনকে আইনগতভাবে আরও শক্তিশালী করতে উচ্চশিক্ষা কমিশন বাস্তবায়নে দ্রত পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন। সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপক বা সহযোগী অধ্যাপককে আকর্ষণীয় সুযোগ-সুবিধা দিয়ে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য অপেক্ষাকৃত কম প্রতিষ্ঠিত সরকারি

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রেষণে পাঠানো যেতে পারে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশাপাশি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠায় উদ্যোক্তাদের উৎসাহিত করা যেতে পারে। সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনিয়র শিক্ষকরা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠদান করতে পারেন সেজন্য সুনির্দিষ্ট নীতিমালা করা যেতে পারে। অভিজ্ঞ শিক্ষকদের ঘাটতি পূরণ করার জন্য অবসরে যাওয়া শিক্ষকদের সম্মতি সাপেক্ষে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ করা যেতে পারে। এজন্য কমিশন অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষকদের একটি ডাইরেক্টরি তৈরি করে সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠাতে পারে। শিক্ষক-শিক্ষার্থীর অনুপাত যৌক্তিক পর্যায়ে নির্ধারণ করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। শিক্ষার গুণগতমান নিশ্চিত করতে অ্যাক্রেডিটেশন কাউন্সিলের কার্যক্রম দ্রুত কার্যকর করা জরুরি বলে মত দেয় সংস্থাটি।